সমাস মানে সংক্ষেপ, মিলন, একাধিক পদের একপদীকরণ।
অর্থসম্বন্ধ আছে এমন একাধিক শব্দের এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন শব্দ গঠনের প্রকৃয়াকে সমাস বলে।
সমাস প্রধানত ছয় প্রকার। যথাঃ- দ্বন্ধ সমাস, দ্বিগু সমাস, কর্মধারয় সমাস, অব্যয়ীভাব সমাস, তৎপুরুষ সমাস, বহুব্রীহি সমাস।
১। দ্বন্ধ সমাসঃ যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের সমান প্রাধান্য থাকে, তাকে দ্বন্ধ সমাস বলে। যেমনঃ-
তাল ও তমাল= তাল-তমাল, দোয়াত ও কলম=দোয়াত-কলম, মাতা ও পিতা=মাতাপিতা ইত্যাদি।
দ্বন্ধ সমাসে পূর্বপদ ও পরপদের সম্বন্ধ বোঝানোর জন্য ব্যাসবাক্যে এবং, ও আর -এ তিনটি অব্যয় পদ ব্যবহৃত হয়।
#অলুক দ্বন্ধঃ-যে দ্বন্ধ সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ হয় না, তাকে অলুক দ্বন্ধ বলে। যেমনঃ-দুধে-ভাতে, জলে-স্থলে, দেশে-বিদেশে, হাতে-কলমে।
# তিন বা বহু পদে দ্বন্ধ সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্ধ সমাস বলে। যেমনঃ সাহেব-বিবি-গোলাম, হাত-পা-নাক-মুখ-চোখ ইত্যাদি।
2. দ্বিগু সমাসঃ
সমাহার বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে। দ্বিগু সমাসে সমাস নিষ্পন্ন পদটি বিশেষ্য পদ হয়। যেমনঃ-
তিন কালের সমাহার=ত্রিকাল, চৌরাস্তার সমাহার=চৌরাস্তা, তিন মাথার সমাহার=তেমাথা, শত অব্দের সমাহার=শতাব্দী, পঞ্চবটের সমাহার=পঞ্চবটী, ত্রি(তিন)পদের সমাহার=ত্রিপদী,
3. কর্মধারয় সমাসঃ
যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধান রূপে প্রতিয়মান হয়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।যেমনঃ নীল যে পদ্ম=নীলপদ্ম, শান্ত অথচ শিষ্ট=শান্তশিষ্ট, কাঁচা অথচ মিঠা=কাঁচামিঠা ।
কর্মধারয় সমাস কয়েক প্রকারে সাধিত হয়। যেমনঃ
(i) দুটি বিশেষণ পদে একটি বিশেষ্যকে বোঝাল । যেমনঃ- যে চালাক সেই চতুর=চালাক-চতুর ।
(ii) দুটি বিশেষ্য পদ একই ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝালে । যেমনঃ- যিনি জজ তিনিই সাহেব=জজ সাহেব ।
(iii) কার্যে পরস্পরা বোঝাতে দুইটি কৃতন্ত বিশেষণ পদেও কর্মধারয় সমাস হয় । যেমনঃ আগে ধোয়া পরে মোছা=ধোয়ামোছা ।
(iv) পূর্বপদে স্ত্রীবাচক বিশেষণ থাকলে কর্মধারয় সমাসে সেটি পুরুষ বাচক হয়। যেমনঃ সুন্দরী যে লতা=সুন্দরলতা, মহতী যে কীর্তি=মহাকীর্তি ।
(v) বিশেষণবাচক মহান বা মহৎ শব্দ পূর্বপদ হলে, মহান ও মহৎ এর স্থানে মহা হয়। যেমনঃ মহৎ যে জ্ঞান=মহাজ্ঞান, মহান যে নবি=মহানবি ।
(vi) পূর্বপদে কু বিশেষণ থাকলে এবং পরপদের প্রথমে স্বরধ্বনি থাকলে কু এর স্থানে কদ হয় । যেমনঃকু যে অর্থ= কদর্থ, কু যে আচার=কদাচার ।
(vii) পরপদে রাজা শব্দ থাকলে কর্মধারয় সমাসে রাজ হয়। যেমনঃ মহান যে রাজা=মহারাজ ।
(viii) বিশেষণ ও বিশেষ্য পদে কর্মধারয় সমাস হলে কখনো কখনো বিশেষণ পরে আসে, বিশেষ্য আগে যায়। যেমনঃ সিদ্ধ যে আলু=আলুসিদ্ধ, অধম যে নর=নরাধম ।
কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদঃ
কর্মধারয় সমাস ৫ প্রকারঃ
ক) সাধারণ কর্মধারয় সমাস
খ) মধ্যপদলোপী কর্মধারায়
গ)উপমান কর্মধারায়
ঘ) উপমিত কর্মধারায় এবং
ঙ) রূপক কর্মধারায় সমাস
ক) সাধারণ কর্মধারায় সমাসঃ
সাধারণ কর্মধারায় সমাসের তিনটি শ্রেণী আছে।
>> বিশেষণ + বিশেষ্য (পূর্বপদ বিশেষণ এবং পরপদ বিশেষ্য)
উদাহারণঃ
• নীল যে পদ্ম= নীলপদ্ম
• সুন্দরী যে লতা= সুন্দরলতা
• অধম যে নর= নরাধম
• মহান যে রাজা= মহারাজা
>> বিশেষ্য + বিশেষ্য (উভয়পদ বিশেষ্য)
উদাহারণঃ
• যিনি জজ তিনিই সাহেব= জজসাহেব
• যিনি রাজা তিনি ঋষি= রাজর্ষি
• যিনি পিতা তিনি দেব= পিতৃদেব
• যিনি ব্রাহ্মণ তিনি = ব্রাহ্মণপণ্ডিত
>> বিশেষণ + বিশেষণ (উভয়পদ বিশেষণ)
উদাহারণঃ
• যিনি গণ্য তিনি মান্য = গণ্যমান্য
• যাহা মৃদু তাহাই মন্দ = মৃদুমন্দ
• যে শান্ত সেই শিষ্ট = শান্তশিষ্ট
• নীল অথচ লোহিত = নীললোহিত
(খ) মধ্যপদলোপী সমাসঃ
যে সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ হয়, তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে।
উদাহারণঃ
• সিংহ চিহ্নিত আসন= সিংহাসন
• সাহিত্য বিষয়ক সভা= সাহিত্যসভা
• স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ= স্মৃতিসৌধ
• চিকিৎসা বিষয়ক শাস্ত্র= চিকিৎসাশাস্ত্র‌‌
• ঘরজামাই= ঘর আশ্ৰিত জামাই
• মৌ সংগ্রহকারী মাছি= মৌমাছি
• মোম নির্মিত বাতি= মোমবাতি
(গ) উপমান কর্মধারয়ঃ
সাধারণ গুণবাচক পদের সাথে উপমানবাচক পদের যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারায় সমাস বলে। যেমন-
ভ্রমরের ন্যায় কৃষ্ণ কেশ= ভ্রমরকৃষ্ণকেশ।
এখানে ‘ভ্রমর’ উপমান ও ‘কেশ’ উপমেয় এবং ‘কৃষ্ণত্ব’ সাধারণ ধর্ম। উপমান -এর অর্থ তুলনীয় বস্তু। প্রত্যক্ষ কোনো বস্তুর সাথে পরোক্ষ কোনো বস্তুর তুলনা করলে প্রত্যক্ষ বস্তুটিকে বলা হয় উপমেয়, এবং যার সাথে তুলনা করা হয়েছে তাকে বলা হয় উপমান।
উদাহারণঃ
• তুষারের ন্যায় শুভ্র= তুষারশুভ্র
• অরুণের ন্যায় রাঙা= অরুণরাঙা
• রক্তের ন্যায় লাল= রক্তলাল
• ঘনের ন্যায় শ্যাম= ঘনশ্যাম
• বকের ন্যায় ধার্মিক= বকধার্মিক
• হিমের ন্যায় শীতল= হিমশীতল
• কাজলের ন্যায় কালো= কাজলকালো
(ঘ) উপমিত কর্মদারয় সমাসঃ
উপমেয় পদের সঙ্গে উপমানের যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারায় সমাস বলে । যেমন-
কথা অমৃতের ন্যায় = কথামৃত
এক্ষেত্রে সাধারণ গুণটি ব্যাসবাক্য বা সমস্তপদে থাকে না, অনুমান করে নেওয়া হয়। এ সমাসে উপমেয় পদটি পূর্বে বসে।
উদাহরণঃ
• মুখ চন্দ্রের ন্যায়= চন্দ্রমুখ
• পুরুষ সিংহের ন্যায়= সিংহপুরুষ
• চরণ কমলের ন্যায় = চরণকমল
• বীর সিংহের ন্যায়= বীরসিংহ
• নর সিংহের ন্যায়= নরসিংহ
(ঙ) রূপক কর্মধারায়ঃ
উপমান ও উপমেয়র মধ্যে অভিন্নতা কল্পনা করা হলে তাকে রুপক কর্মধারায় সমাস বলে । যেমন-
মন রূপ মাঝি= মনমাঝি
এ সমাসে উপমেয় পদ পূর্বে বসে ও উপমান পদ পরে বসে।
সমস্যমান পদে ‘রূপ’ অথবা ‘ই’ যোগ করে ব্যাসবাক্য গঠন করা হয়।
উদাহারণঃ
• বিদ্যা রুপ ধন= বিদ্যাধন
• হৃদয় রূপ মন্দির= হৃদয়মন্দির
• জ্ঞান রূপ বৃক্ষ= জ্ঞানবৃক্ষ
• জীবন রূপ প্রদীপ = জীবনপ্রদীপ
• শোক রূপ অনল= শোকানল
• জীবন রূপ স্রোত= জীবনস্রোত
তৎপুরুষ সমাস কাকে বলে?
পূর্বপদের বিভক্তির লোপের যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বুঝায় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। তৎপুরুষ সমাসের পূর্বপদে দ্বিতীয়া থেকে সপ্তমী পর্যন্ত যে কোন বিভক্তি থাকতে পারে। আর পূর্বপদের বিভক্তি অনুসারে এদের নামকরণ হয়। তৎপুরুষ সমাসকে কারকলোপী সমাসও বলা হয়। যেমনঃ বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন। এখানে দ্বিতীয়া বিভক্তি ‘কে’ লোপ পেয়েছে বলে এর নাম দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস।
তৎপুরুষ সমাসের প্রকারভেদ
বিভক্তি লোপ অনুসারে তৎপুরুষ সমাস ছয় প্রকার। তবে ছয় প্রকার তৎপুরুষ সমাস ছাড়াও আরও তিন প্রকার তৎপুরুষ সমাস দেখা যায়। সুতরাং তৎপুরুষ সমাস মোট নয় প্রকার।
>> দ্বিতীয়া তৎপুরুষ >> তৃতীয়া তৎপুরুষ >> চতুর্থী তৎপুরুষ >> পঞ্চমী তৎপুরুষ >> ষষ্ঠী তৎপুরুষ >> সপ্তমী তৎপুরুষ >> উপপদ তৎপুরুষ >> নঞ্ তৎপুরুষ ওAdvertisements >> অলুক তৎপুরুষ
দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস
পূর্বপদে দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে ইত্যাদি) লোপ হয়ে যে তৎপুরুষ সমাসে উত্তরপদের অর্থ প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। প্রাপ্ত, আশ্রিত, গত, আপন্ন, অতীত, প্রবিষ্ট, সংক্রান্ত ইত্যাদি শব্দযোগে এই সমাস হয়। যেমন: প্রাপ্তঃ হর্ষকে প্রাপ্ত = হর্ষপ্রাপ্ত, বয়ঃকে প্রাপ্ত = বয়ঃপ্রাপ্ত, সাহায্যকে প্রাপ্ত = সাহায্যপ্রাপ্ত, দুঃখকে প্রাপ্ত = দুঃখপ্রাপ্ত, জ্ঞানকে অর্জন = জ্ঞানার্জন আশ্রিতঃ দেবকে আশ্রিত = দেবাশ্রিত, চরণকে আশ্রিত = চরণাশ্রিত। গতঃ ব্যক্তিকে গত = ব্যক্তিগত, মর্মকে গত = মর্মগত, পুঁথিকে গত = পুঁথিগত, পরলোকে গত = পরলোকগত। আপন্নঃ বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন, বিস্ময়কে আপন্ন = বিস্ময়াপন্ন। অতীতঃ মরণকে অতীত = মরণাতীত, বর্ণনাকে অতীত = বর্ণনাতীত, লােককে অতীত = লােকাতীত প্রবিষ্টঃ গৃহকে প্রবিষ্ট = গৃহপ্রবিষ্ট। আরূঢ়ঃ অশ্বকে আরূঢ় = অশ্বারূঢ়, সিংহাসনকে আরূঢ় = সিংহাসনারূঢ়। সংক্রান্তঃ ধর্মকে সংক্রান্ত = ধর্ম সংক্রান্ত। ব্যাপ্তি বােঝালে কালবাচক শব্দের সঙ্গে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। অর্থাৎ, ব্যাপ্তি বোঝালে পূর্বপদে কালবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য বা বিশেষণ পদ যুক্ত হলে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমনঃ চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী = চিরসুখী, চিরকাল ব্যাপিয়া বসন্ত = চিরবসন্ত, ক্ষণকাল ব্যাপিয়া স্থায়ী = ক্ষণস্থায়ী, জীবন ব্যাপিয়া আনন্দ = জীবনানন্দ, বহুকাল ব্যাপিয়া প্রচলিত = বহুপ্রচলিত। ভাবে, রূপে, যথা তথা – এ ধরনের শব্দের ব্যবহারে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ হয়। যেমনঃ ঘনভাবে সন্নিবিষ্ট = ঘনসন্নিবিষ্ট, দৃঢ়রূপে বদ্ধ = দৃঢ়বদ্ধ, অবশ্য যথা তথা কর্তব্য = অবশ্যকর্তব্য, দ্রত যথা তথা গামী = দ্রতগামী। অন্যান্য দৃষ্টান্ত – গা-কে ঢাকা = গাঢাকা, রথকে দেখা = রথদেখা, কলাকে বেচা = কলাবেচা ইত্যাদি। এরকম– ভাতরাধা, ছেলে-ভুলানাে (ছড়া), নভেল-পড়া ইত্যাদি। তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমনঃ শ্রম থেকে লব্ধ = শ্রমলব্ধ। লাঠি দিয়ে পেটা = লাঠিপেটা। রক্ত দ্বারা সিক্ত = রক্তসিক্ত ইত্যাদি। চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস পূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি (কে, রে বা জন্য, নিমিত্ত) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমনঃ বিয়ের জন্য পাগল = বিয়েপাগল। রান্নার জন্য ঘর = রান্নাঘর। পাগলের জন্য গারদ = পাগলাগারদ ইত্যাদি। পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস পূর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে, চেয়ে) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমনঃ ঋণ থেকে মুক্ত = ঋণমুক্ত। প্রাণের চেয়ে প্রিয় = প্রানপ্রিয়। সর্ব থেকে শ্রেষ্ঠ = সর্বশ্রেষ্ঠ ইত্যাদি। মনে রাখতে হবেঃ সাধারণত পুত, আগত, ভীত, গৃহীত, মুক্ত, উত্তীর্ণ, চালানো, ভ্রষ্ট ইত্যাদি প্রকাশ হলে পঞ্চমী তৎপুরুষ হয়। কোন কোন সময়ে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাসের ব্যাসবাক্যে “এরঃ”, “চেয়ে” ইত্যাদি অনুসর্গ ব্যবহার করা হয়। ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস পূর্বপদে ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমনঃ কবিদের গুরু = কবিগুরু। মনে রাখতে হবেঃ ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদে ঈ-কার যুক্ত শব্দে ই-কার হয়। যেমনঃ মন্ত্রীদের সভা=মন্ত্রিসভা। ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসে “রাজা” শব্দ থাকলে তা “রাজ” হয়ে যায়। যেমনঃ রাজার পুত্র=রাজপুত্র। ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসে “পিতা মাতা ভ্রাতা” স্থলে “পিতৃ, মাতৃ, ভ্রাতৃ” হয়। যেমনঃ পিতার স্নেহ=পিতৃস্নেহ, মাতার সেবা=মাতৃসেবা। পরপদে রাজি, গ্রাম, বৃন্দ, গণ, যুথ প্রভৃতি সমষ্টিবাচক শব্দ থাকলে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন- ছাত্রের বৃন্দ। = ছাত্রবৃন্দ, গুণের গ্রাম = গুণগ্রাম ইত্যাদি। এ রুপ– গ্রন্থরাজি, লেখকগণ, হস্তীযূথ ইত্যাদি। ‘অধ’ শব্দটি ব্যাসবাক্যে পরে থাকে কিন্তু সমস্তপদে আগে চলে আসে, অর্থাৎ ‘অর্ধ’ শব্দ পরপদ হলে সমস্তপদে তা পূর্বপদ হয়। যেমন : সেরের অর্ধ = অর্ধসের, পথের অর্ধ = অর্ধপথ ইত্যাদি। সপ্তমী তৎপুরুষ যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের সপ্তমী বিভক্তি (এ, তে, এতে, য়, মধ্যে ইত্যাদি) লুপ্ত হয় এবং উত্তরপদের অর্থ প্রধান থাকে তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন- কর্মে নিপুণ = কর্মনিপুণ, দিবায় নিদ্রা = দিবানিদ্রা, বিশ্বের মধ্যে বিখ্যাত = বিশ্ববিখ্যাত, পুরুষের মধ্যে উত্তম =পুরুষােত্তম, কার্যে দক্ষ = কার্যদক্ষ, সখ্যোয় গরিষ্ঠ = সংখ্যাগরিষ্ঠ, সংখ্যায় লঘিষ্ঠ = সংখ্যালঘিষ্ঠ, দানে বীর = দানবীর, গাছে পাকা = গাছপাকা, মাথায় ব্যথা = মাথাব্যথা, গলাতে ধাক্কা = গলাধাক্কা। লক্ষণীয় : সপ্তমী তৎপুরুষ সমাসে কখনাে কখনাে ব্যাসবাক্যের পূর্বপদটি পরে বসে। যেমন : পূর্বে অভূত = অভূতপূর্ব; পূর্বে ভূত = ভূতপূর্ব, পূর্বে অদৃষ্ট = অদৃষ্টপূর্ব ইত্যাদি। অলুক ষষ্ঠ তৎপুরুষ সমাস ঘােড়ার ডিম, মাটির মানুষ, হাতের পাঁচ, মামার বাড়ি, সাপের পা, মনের মানুষ, কলের গান ইত্যাদি। কিন্তু ভ্রাতার পুত্র = ভ্রাতুষ্পুত্র (নিপাতনে সিদ্ধ)। উপপদ তৎপুরুষ সমাস কোনাে শব্দকে বিশ্লেষণ করলে যদি প্রথমে একটি পদ, তারপর একটি ধাতু এবং শেষে একটি প্রত্যয় পাওয়া যায়, তা হলে পদটিকে ‘উপপদ বলে’। ‘উপপদ’ শব্দের অর্থ সমীপবর্তী বা নিকটবর্তী পদ। ধাতুর সঙ্গে উপপদের সমাসকে উপপদ তৎপুরুষ সমাস বলে। অথবা, যে পদের পরবর্তী ক্রিয়ামূলের সঙ্গে কৃৎ প্রত্যয় যুক্ত হয় সে পদকে উপপদ বলে। কৃদন্ত পদের সঙ্গে উপপদের যে সমাস হয়, তাকে বলে উপপদ তৎপুরুষ সমাস। যেমন— ‘সে পা-চাটা কুকুর’ বাক্যে ‘পা-চাটা’ সমাসবদ্ধ পদ; এর ব্যাসবাক্য হল ‘পা চাটে যে’। এখানে ‘পা’ উপপদের সঙ্গে ‘চাট’- ধাতুর সমাস হয়েছে এবং ধাতুর পরে ‘আ’- প্রত্যয় (চাট + আ) যুক্ত হয়ে ‘পা-চাটা’ পদ তৈরি হয়েছে। এজন্যই ‘পা-চাটা’ উপপদ তৎপুরুষ সমাস। যেমন : জলে চরে যে = জলচর, গৃহে অবস্থান করে যে = গৃহস্থ, পঙ্কে জন্মে যা = পঙ্কজ, জল দেয় যে = জলদ, সত্য বলে যে = সত্যবাদী, অগ্রে জন্মে যে = অগ্রজ, কলম পেষে যে = কলম-পেষা (কেরানী), মানুষ খায় যে = মানুষখেকো। (বাঘ), সর্বনাশ করে যে = সর্বনাশা/সর্বনাশী ইত্যাদি। নঞ্‌ তৎপুরুষ সমাস যে তৎপুরুষ সমাসের পূর্বপদ নঞর্থক বা নিষেধাৰ্থক বা না-বাচক অব্যয় (না, নেই, নাই, নয়) তাকে নঞ তৎপুরুষ সমাস বলে। সংস্কৃত নঞ্‌ অব্যয়ের বাংলা রূপ হচ্ছে : অ, অন, অনা, আ, গ, ন, না, বি এবং বে। যেন নাই মিল = অমিল, নয় আহূত = অনাহূত, নয় লুনি = আলুনি, নয় অতি দূর = অনতিদূর, নয় রাজি = নারাজ, নাই আশা = নিরাশা, নাই শৃঙ্খলা = বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি। খাঁটি বাংলায় অ, আ, না কিংবা অনা হয়। যেমন- ন কাল = অকাল বা আকাল। তদুপ- অকেজো, আধােয়া, অজানা, অচেনা, আলুনি, নাছােড়, অনাবাদি, নাবালক ইত্যাদি। নঞ্‌ তৎপুরুষ সমাসের আরও কিছু উদাহরণঃ পূর্বপদে অ : যেমন : অকাতর, অকথ্য, অকপট, অক্ষম, অক্ষুন্ন, অখ্যাত, অচল, অজ্ঞাত, অধৈর্য, অনিবার্য, অফুরন্ত, অপরিণত, অপ্রিয়, অব্যক্ত, অম্লান, অভয়, অভাব, অভদ্র, অসময় ইত্যাদি। পূর্বপদে অন্/ অনা : যেমন : অনুদার, অনভিজ্ঞ, অনশন, অনাকাঙ্ক্ষিত, অনাচার, অনাদর, অনাদি, অনাবশ্যক, অনাবৃষ্টি, অনিচ্ছা, অনিষ্ট, অনুর্বর ইত্যার্দি। পূর্বপদে আ : যেমন : আকাড়া, আগাছা ইত্যাদি। পূর্বপদে গর : যেমন : গরমিল, গরহাজির ইত্যাদি। পূবপদে ন/ না : যেমন : নাতিদীর্ঘ, নাতিখব, নাখােশ, না-জানা, না-বলা, নাছােড়বান্দা, নারাজ ইত্যাদি। পূর্বপদে নি/ নিরঃ যেমন : নিখুঁত, নিরামিষ, নিরুৎসাহ ইত্যাদি। পূর্বপদে বি / বে : যেমন : বিদেশ, বিপাক, বেআইনি, বেকায়দা, বেজোড়, বেসরকারি, বেহিসাব ইত্যাদি। না-বাচক অর্থ ছাড়াও বিশেষ বিশেষ অর্থে নঞ্‌ তৎপুরুষ সমাস হতে পারে। যথা অভাব – ন বিশ্বাস = অবিশ্বাস (বিশ্বাসের অভাব) ভিন্নতা – ন লৌকিক = অলৌকিক অল্পতা – ন কেশা = অকেশা বিরােধ – ন সুর = অসুর অপ্রশস্ত ন কাল = অকাল মন্দ – ন ঘাট = অঘাট। এ রকম- অমানুষ, অসঙ্গত, অভদ্র, অনন্য, অগম্য ইত্যাদি। অলুক তৎপুরুষ সমাস পূর্বপদের বিভক্তি লােপ না পেয়ে তৎপুরুষ সমাস হলে তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে। ‘অলুক’ শব্দের অর্থ অ-লােপ, অর্থাৎ লােপ না হওয়া। যেমন : সােনার তরী = সােনারতরী; চিনির বলদ = চিনিরবলদ, তেলে ভাজা = তেলেভাজা; খেলার মাঠ = খেলারমাঠ ইত্যাদি। এ রূপ- গায়েপড়া, ঘিয়েভাজা, কলেরগান, গরুরগাড়ি ইত্যাদি। ☆☆ গায়ে-হলুদ, হাতে-খড়ি প্রভৃতি সমস্তপদে পরপদের অর্থ প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয় না অর্থাৎ হলুদ বা খড়ি বােঝায় না, অনুষ্ঠান বিশেষকে বােঝায়। সুতরাং এগুলাে অলুক তৎপুরুষ সমাস নয়, অলুক বহুব্রীহি সমাস। সব রকম তৎপুরুষ সমাসই অলুক হতে পারে। যেমন : অলুক তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস : যেমন : চোখ দিয়ে দেখা = চোখে-দেখা। এ রকম : কলে-ঘঁটা, ঘিয়ে-ভাজা, জলে-ভেজা, দায়ে-কাটা, পায়ে-চলা, পােকায়-কাটা, বাশে-বাঁধা, বানে-ভাসা, রঙে-আঁকা, রােদে-পােড়া, শিশির-ভেজা, সাপে-কাটা, সুরে-বাধা, হাতে-গড়া ইত্যাদি। অলুক চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস : যেমন: খেলার জন্যে মাঠ = খেলার মাঠ। এ রকম : চায়ের কাপ, গায়ের চাদর, নাচের নূপুর, তেলের শিশি, পড়ার টেবিল, পাকের ঘর ইত্যাদি। অলুক পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস : যেমন : ঘানি থেকে তেল = ঘানির তেল। এ রকম : তিলের তেল, কলের জল, নাকের জল ইত্যাদি। অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস : যেমন : খবরের কাগজ = খবরের কাগজ। এ রকম : চিনির কল, গরুর দুধ, চোখের বালি, টাকার কুমির, ডুমুরের ফুল, তাসের ঘর, পায়ের চিহ্ন, মনের মানুষ, মামার বাড়ি, মগের মুল্লুক ইত্যাদি। অলুক সন্তমী তৎপুরুষ সমাস : যেমন : অরণ্যে রােদন = অরণ্যে রােদন। এ রকম : কলেজে পড়া, কলে ছাঁটা, গায়ে হলুদ, গােড়ায় গলদ, ঘিয়ে-ভাজা, ছাঁচে ঢালা, দায়ে ঠেকা, দিনে ডাকাতি, নাকে খত, পায়ে ধরা, মনে রাখা, সােনায় সােহাগা, দায়ে পড়া ইত্যাদি।